তুহিন রেজা বাংলাদেশ ব্যাংককে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে বহাল তবিয়তে, চাকরিতেযোগদানের জীবন বিত্তান্তে বিভ্রান্তি, গ্রামের ধারাভাষ্যকার থেকে এখন সিইও

দুর্নীতি-অনিয়মেও বহাল

নিজস্ব প্রতিবেদক : নানা অনিয়ম আর দুর্নীতিতে জড়িয়ে কোটিপতি এখন ফার্স্ট ফাইন্যান্সলিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তুহিন রেজা। বিভিন্ন অদৃশ্য ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নানাঅভিযোগ থাকার পরও বহাল থাকা তুহিন রেজার আমল নামা এখন বেজায় ভারি। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেড। নানাবিতর্কের মধ্যদিয়ে জন্ম দেয়া এই প্রতিষ্ঠানটি পড়েছে একাধিকবার নানা বিপাকে। নানাঅব্যাবস্থাপনায় এই প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও ছিল অনেক বিদ্যমান।

নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগেবাংলাদেশ ব্যাংকের ৪ কোটি টাকা জরিমানার মুখে এর আগে চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ চৌধুরী পদত্যাগ করলে তার ভাই ফয়সাল আহমেদ চৌধুরীকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যিনি আগে ছিলেন ভাইস চেয়ারম্যান। এরপর বর্তমানেচেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলম। আর ব্যাবস্থাপনাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করছে তুহিন রেজা। চাকরিতে যোগদানের শুরুটাই যার হয়দুর্নীতিতে দিয়ে সেই চাকরিতে কতটা দুর্নীতি আর অনিয়ম হতে পারে তা হয়তো বলেও শেষকরার মত না। ব্যাপক অনুসন্ধানে বেড় হয়ে আসে ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডে বর্তমানকর্মরত ব্যাবস্থাপনা পরিচালক মোঃ তুহিন রেজার ব্যপক দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র আরএক অদৃশ্য ক্ষমতার জোড়।

সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসের ১৩তারিখফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। নিয়োগকালীন সময়ে তুহিন রেজাব্যক্তিগত সিবিআই (CBI Status) সংক্রান্ত তথ্য গোপন করেন। পরবর্তীতে এইচ আর ডি(HRD) কতৃক তুহিন রেজার ব্যক্তিগত নথিতে সংযোজন করা হলেও পরবর্তীতে ক্ষমতারঅপব্যাবহার করে ব্যক্তিগত নথি থেকে সরিয়ে ফেলারও অভিযোগ ওঠে তুহিন রেজার বিরুদ্ধে।এ বিষয়টি সম্পুর্ন অস্বীকার করেন তুহিন রেজা। তবে এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়,তুহিন রেজা ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিঃ এর মাণোব সম্পদ বিভাগ থেকে ফাইল নিয়ে তারসিবিআই প্রতিবেদন (CBI REPORT) সরিয়ে ফেলেন যা মানব সম্পদ বিভাগের তৎকালীনকর্তব্যরত আজমিরী ইসলাম, মোঃ ইব্রাহীম, এবং আশেক মাহমুদ স্বীকার করেন। এদিকে চাকরিতে যোগদানের পুর্বে ও পরে পৃথক দুইটি জীবন বিত্তান্তদিয়েছেন তুহিন রেজা যা একটির সাথে অপরটির তথ্যের মিল ছিলনা এবং মিথ্যা ও ভুল তথ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠান কতৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করেন। তুহিন রেজার চাকরিতে যোগদানের পর ২৭৬তমপর্ষদ সভায় তাকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীর চলতি দায়িত্ব প্রদান করাহয়। তবে কথায় আছে চোরে না শুনে ধর্মের বানী। দায়িত্ব পাওয়ার পর পরই একক সাক্ষরেমাত্র ১মাসে ২৩জন কর্মকর্তা কর্মচারীকে নিয়োগ প্রদান করেন। কিন্তু উক্ত নিয়োগের বিষয়য়েসার্ভিস রুলস এর ৩.৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিয়ম মেনে সংবাদপত্র এবং অনলাইনেনিয়মানুসারে বিজ্ঞাপন দেয়ার কথা থাকলে কোথাও কোন বিজ্ঞপ্তি দেননি তুহিন রেজা। পাসাপাসিকোন প্রকার নিয়ম মাফিক সাক্ষাৎকার ব্যতিরেখেই ২৩জনকে নিয়োগ প্রদান করেছেন।

এবিষয়েবাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন যুগ্ম-পরিচালক মোহাম্মদ ইমাম হোসেন স্বাক্ষরিত একচিঠিতে তুহিন রেজার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ প্রদান করা হয়। চিঠিতেবলা হয়, ২৭৬তম পর্ষদ সভায় তুহিন রেজাকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের চলতি দায়িত্বেরস্বীকৃতি দেয়া হলেও কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগের কোন সিদ্ধান্ত দেয়া হয়নি। চিঠিতেআরও বলা হয়, নিয়োগকৃত ২২জন কর্মকর্তা কর্মচারী মধ্যে ২০-১০-২০১৬ তারিখে নিপেন্দ্রচন্দ্র পন্ডিতের অনুকুলে এসইভিপি পদে নিয়োগ ইস্যু করা হয়। তবে নিপেন্দ্র চন্দ্রপন্ডিত পিপলস লিজিংয়ে করমকালীন সময়ে বিভিন্ন অনিয়মের সাথে জড়িত ছিলেন। ২৭৭তম পর্ষদসভায় নিপেন্দ্র চন্দ্র পন্ডিত এর নিয়োগ প্রস্তাব উত্থাপিত হলে পিপলস লিজিংয়েকর্মরত থাকাবস্থায় তার কার্যক্রমসহ ঐ প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি ছাড়পত্র গ্রহন করেছেকিনা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষকের কাছে দেয়া হয়েছে কিনা এবিষয়েও কোনসিদ্ধান্ত হয়নি।

এছাড়াও ২৭৮তম পর্ষদ সভায় তুহিন রেজা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথেমিথ্যাচার করেছে বলেও জানা যায়। এক নথি পর্যালোচনা করে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন,সিআইবি অনুসন্ধান এবং ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড থেকে তুহিন রেজার ব্যবহৃত ক্রেডিটকার্ড এবং অপর দশজন ব্যাক্তির ক্রেডিট কার্ডের গ্যারান্টির বিপরিতে মোট ১কোটি৪৮লক্ষ ৬৯হাজার ৯০৮টাকা খেলাপি ছিল। তার এসব ঋণকে ক্ষতিজনক বলে মনে করে বাংলাদেশব্যাংক।জানা গেছে, তুহিন রেজা ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব)পালনকালে নিজ প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিকপ্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ কতৃক০৬/০৩/২০১৭ তারিখ একটি পরিদর্শন রিপোর্টের ভিত্তিতেএকটি অভিযোগনামা দাখিল করা হয় এবং অভিযোগটি প্রমানিত হওয়ায় ২৭/০৪/২০২৭ তারিখঅনুষ্ঠিত ২৮৩ নং পরিচালনা পর্ষদ সভায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) তুহিন রেজার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়াহলেও তার ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের কথা চিন্তা করে সেচ্ছায় পদত্যাগের সুযোগ দেয়া হয় এবংতুহিন রেজা ০২/০৫/২০১৭ সেচ্ছার পদত্যাগপত্র প্রদান করলে তা কার্যকর করা হয়।

পরবর্তীতেতিনি রহস্যজনকভাবে পুনরায় অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগদান করেনফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডে। পরবর্তীতে তুহিন রেজাকে ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসেব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) দেয়া হয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ,বাংলাদেশ ব্যাংক-এর জারীকৃত সার্কুলার নং ২ এর ১২(গ) এর বিধান মোথাবেক ব্যবস্থাপনাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) দায়িত্বপ্রাপ্তকে কোনভাবেই ৯০ দিনের বেশি রাখা যায় না। এই৯০ দিনের মধ্যেই দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাক্তির স্থলে একজন স্থায়ী ব্যাবস্থাপনা পরিচালকনিয়োগের যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নিয়োগ প্রদান করতে বিধান রয়েছে।

এদিকে ৯০দিনের যায়গায় দির্ঘ ৮মাস পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনস্থায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ না দিয়ে নিজেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবেচলতি দায়িত্ব পালন করে আসছেন। গোপন সূত্রে জানা গেছে, ৯০দিনের বাধ্যবাধকতা শেষ করে প্রতিষ্ঠানেরপর্ষদকে বাধ্য ব্যপস্থাপনা পরিচালকের নিয়োগের সময় বৃদ্ধি করার জন্য বাংলাদেশব্যাংকে পত্র প্রেরনের জন্য। অপরদিকে স্থায়ী ব্যাবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে তুহিনরেজা তার নিজের নিয়োগ নিশ্চিত করতেই উঠেপরে লেগেছে। এজন্য তিনি কোন প্রকার নিয়োগবিজ্ঞপ্ত দেননি এমনকি পর্ষদ সভায় কোন প্রকার সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়াওকরা হয়নি বলেও জানা গেছে।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, তুহিন রেজা নিজের নামের প্রতিষ্ঠান টিআর ইন্টারন্যাশনাল (T.R.INTERNATIONAL) দাড় করিয়ে তার দাড়া ঋণ অনুমোদন/পাশ করেবাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের জন্য প্রেরন করে থাকেন। এছাড়াও নাম সর্বস্বপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে ঋণ পাশ করে তা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাশ করানোর চেষ্টা চালান তিনি।এদিকে ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেড প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তার পদ দির্ঘ৬মাসের অধিক সময় যাবত শূন্য থাকা স্বত্বেও ব্যক্তি সার্থে এই নিয়োগটির প্রকিয়াও সম্পন্নকরেননি তুহিন রেজা।

জানা যায়, ইতি মধ্যে তার অপকর্ম ও দুর্নীতিতে অতিষ্ট হয়ে পড়েছেপ্রতিষ্ঠানের অনেকেই। তবে তুহিনের রয়েছে বেশ কিছু ক্যাডার বাহিনী তাই নির্যাতনেরভয়ে এবং চাকরি হারানোর ভয়ে কেউই মুখ খুলছে না। ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডের বর্তমানচেয়ারম্যান ইসরাফিল আলমের সাথে গোপন সক্ষতা গড়েই তুহিন রেজা এই প্রতিষ্ঠানে চালিয়েযাচ্ছে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি। তুহিন রেজার গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের কাউখালি থানারবলভদ্রপুর গ্রামে। একসময়ে এলাকায় তিনি গ্রাম্য খেলাধুলার ধারাভাষ্যকারের ভূমিকাপালন করতেন। এছাড়াও যুক্ত ছিলেন স্থানীয় বিএনপির একজন সক্রিয় কর্মি হিসেবে। মধ্যবিত্তপরিবারে জন্মগ্রহন করেও খুব অল্প সময়েই রাতারাতি এলাকায় এখন তার নামে ও বেনামেরয়েছে অঢেল সম্পত্তি। এছাড়াও তার ব্যাংক এক্যাউন্টও এখন অনেক ভারি।

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন

Back to top button