সংবাদ সম্মেলনে সদুত্তর দিতে ব্যর্থ মহানগর ওলামা পরিষদ

সান মিশন রিপোর্ট : নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের (নাসিক) মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী দুইটি মসজিদ ও মাদ্রাসায় হস্তক্ষেপ করছেন বলে অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছে মহানগর উলামা পরিষদ। তবে অভিযোগের স্বপক্ষে গণমাধ্যমকর্মীরা প্রমাণিক দলিল বা নথিপত্র চাইলে তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন তারা। এমনকি যেসব মসজিদ-মাদ্রাসার প্রসঙ্গে অভিযোগ তোলা হয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন না। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলেও কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি উপস্থিত উলামা পরিষদের নেতারা। এদিকে সিটি মেয়রের বক্তব্য, আসন্ন সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উসকানি দেওয়ার চেষ্টা চলছে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদ একেএম শামীম ওসমানের ইন্ধনে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে বলেও দাবি সিটি মেয়র আইভীর।

এর পূর্বেও গত ১২ ফেব্রুয়ারী একই অভিযোগে শহরের চাষাঢ়ায় জুমার পরে মহানগর উলামা পরিষদের ব্যানারে সমাবেশ করে হেফাজতের নেতারা। ওই সমাবেশে সিটি মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন তারা। সিটি মেয়রের উদ্দেশ্যে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য প্রদানসহ তাকে বুড়িগঙ্গা নদীতে নিক্ষেপ করারও হুমকি প্রদান করা হয় ওই সমাবেশ থেকে যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার (১৮ ফেব্রুয়ারী ) বেলা তিনটায় নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাব ভবনের তৃতীয় তলার সিনামন রেস্তোরাঁয় একই ব্যানারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ঘন্টাব্যাপী চলে এ সংবাদ সম্মেলন। যদিও এই সংবাদ সম্মেলন চাষাঢ়ার বাগে জান্নাত জামে মসজিদ সংলগ্ন শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে করার কথা ছিল। পরে স্থান পরিবর্তন করে আয়োজকরা।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, মহানগর উলামা পরিষদের সভাপতি মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান, সহ-সভাপতি মুফতি আনিস আনসারী, সাধারণ সম্পাদক মুফতি হারুনুর রশিদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মীর আহমদুল্লাহ, অর্থ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন প্রমুখ। উপস্থিত সকলেই ধর্মীয় সংগঠন হেফাজতে ইসলামের পদধারী নেতা।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মুফতি হারুনুর রশিদ সিটি মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, সিটি মেয়র নগরীর মাসদাইরে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের অধীন সিটি কবরস্থান সংলগ্ন হাফেজীয়া মাদরাসা উচ্ছেদ করেছেন এবং চাষাঢ়ায় অবস্থিত বাগে জান্নাত জামে মসজিদ ও দাওরায়ে হাদীস মাদ্রাসায় হস্তক্ষেপ করছেন। মেয়র মসজিদ ও মাদ্রাসার কাজ করতে দিচ্ছেন না বলেও অভিযোগ উলামা পরিষদ নেতাদের।

এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে ইতোপূর্বে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছিলেন সিটি মেয়র ডা. আইভী। গত ১৩ ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যায় আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার ও মিলনায়তেন নাট্যকর্মীদের এক অনুষ্ঠানে এ প্রসঙ্গে সরাসরি কথা বলেন তিনি। সিটি মেয়র বলেন, মাসদাইরে কবরস্থান সংলগ্ন একটি মসজিদ ও অনুমোদনহীন হাফেজিয়া মাদ্রাসাটি ছিল। ২০১০ সালে মসজিদ ও মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির লোকজনের সাথে এক বৈঠকে মসজিদটিকে পুনরায় নির্মাণ ও মাদ্রাসা সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরে ব্যবসায়ী আবু আহমেদ সিদ্দিক স্বেচ্ছায় মাদ্রাসা সরিয়ে নিয়ে অন্যত্র স্থাপন করেন। এবং পুনরায় নির্মিত চারতলা বিশিষ্ট মসজিদটি ২০১৬ সালে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্যদিকে বাগে জান্নাত জামে মসজিদের জন্য ১৯৮৪ সালে ২৪০০ বর্গফুট জমি দেয় তৎকালীন পৌরসভা। পরবর্তীতে তিন দফায় ওই মসজিদের জন্য ১৭ শতাংশ জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেখানে কেবল মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হলেও মাদ্রাসা ও দোকান ঘর নির্মাণ করে ৩১ শতাংশ জমি দখল করে রাখা হয়েছে দাবি সিটি কর্পোরেশনের। মেয়র বলছেন, অনুমোদন দেওয়া জমির উপর পাঁচতলা বিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। মসজিদের মডেলের একটি চিত্রও গণমাধ্যমের কাছে এসেছে। অথচ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এই মসজিদ নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে।

সিটি কর্পোরেশনের এমন বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে সদুত্তর দিতে পারেননি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত উলামা পরিষদ তথা হেফাজতে ইসলামের নেতারা। গণমাধ্যমকর্মীদের এক প্রশ্নের জবাবে হেফাজতে ইসলাম ও উলামা পরিষদের মহানগর শাখার সভাপতি মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান বলেন, তাদের সংগ্রহে সকল দলিল ও নথিপত্র রয়েছে। তবে নথিপত্র দেখতে চাইলে গণমাধ্যমকর্মীদের তা দেখাতে ব্যর্থ হন তিনি। সংবাদ সম্মেলন শেষে নথিপত্র সরবরাহ করবেন বললেও তা না দিয়ে চলে যান।

এদিকে যেসব মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রসঙ্গে অভিযোগ তোলা হচ্ছে সেসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি কিংবা সংশ্লিষ্ট লোকজন কেন সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত নেই; সে বিষয়ে জানতে চাইলেও সদুত্তর দিতে পারেননি উলামা পরিষদের এই নেতা। তিনি দাবি করেন, মাদ্রাসা ও মসজিদ কমিটির লোকজনের সমর্থন তাদের সাথে রয়েছে।

তবে মুফতি হারুনুর রশিদ বলেন, কমিটি দু’টি পক্ষে ভাগ হয়ে গেছে। একটি পক্ষ মেয়রের সাথে সমঝোতা করেছেন অন্য পক্ষ তাদের সাথে আছেন। তারা উপস্থিত না থাকলেও ধর্মীয় নেতা হিসেবে দায়িত্বের জায়গা থেকে সংবাদ সম্মেলনের ডাক দিয়েছেন বলে দাবি করেন।

এদিকে গত সমাবেশে সিটি মেয়রের বিরুদ্ধে বিষোদগার, কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য ও বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন করলে মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান বলেন, ‘সেন্সেটিভ ইস্যুতে বক্তব্য রাখতে গেলে অনেকে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। উত্তেজনাবশত এই ধরনের বক্তব্য দেওয়াটা সমীচীন নয়। এই ধরনের বক্তব্য রাখা অন্যায় হয়েছে।’

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন

Back to top button