বাতিল প্লাস্টিকের ঝুড়ি দিয়ে দৃষ্টিনন্দন মসজিদ বানাল এক ইন্দোনেশীয়

এবারের রমজানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে হয়তো জাকার্তার উপকণ্ঠে ১২শত আটটি প্লাস্টিক বক্স দ্বারা নির্মিত ছোট্ট মসজিদটি মুসল্লিদের সালাত ও কোরআন তিলাওয়াতের আওয়াজে মুখরিত থাকতো।

২০১৯ সালের গোড়ার দিকে নির্মিত ৪২ স্কয়ার মিটারের এই মসজিদটির জন্য এটিই প্রথম রমজান। এটি ইন্দোনেশিয়ার কেবুন আইডিয়া নামক প্রাকৃতিক আমেজে ঘেরা একটি রেস্টুরেন্টের প্রার্থনাকক্ষ।

যদিও করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে এবার জামাতবদ্ধ ইবাদতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, তবু ব্যবহৃত প্লাস্টিক বক্স (ক্রেট) দ্বারা নির্মিত নান্দনিক ডিজাইনের এই মসজিদটি এখনো মানুষের দৃষ্টি কাড়ছে।

কেবুন আইডিয়ার সত্ত্বাধিকারী হান্দোকো হেন্দ্রোয়োনো বলেন, মসজিদটি নির্মাণের পর থেকে স্থানীয়রা এখানে কোরআন তিলাওয়াতসহ স্বল্প পরিসরে বিভিন্ন ধর্মীয় সমাবেশের আয়োজন করার ইচ্ছা পোষণ করেছেন।

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত করোনার কারণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে রেস্টুরেন্ট খুলতে না পারায় আমরা তা করতে পারছি না।

বিনতারো শহরে নির্মিত কোটাক্রাট নামক এই ছোট্ট প্রার্থনাকক্ষটির প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিলো প্রার্থনার পাশাপাশি স্থাপত্য সৌন্দর্য প্রদর্শন করা।

হান্দাকো আরো বলেন, বাতিল প্লাস্টিকের বক্স ব্যবহার করে এই ছোট্ট মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনাটি ছিলো অত্যন্ত চমৎকার। আর তাছাড়া আমাদের রেস্টুরেন্টের গেস্ট ও কর্মচারীদের জন্য একটি প্রার্থনাকক্ষেরও প্রয়োজন ছিলো।

তাই আমরা এটি নির্মাণে সম্মতি দিয়েছিলাম। এখন আমরা সবাই মিলে এখানে সালাত আদায় করতে পারি। প্রথম প্রথম তো অনেকে বুঝতেই পারেনি যে, এটি একটি মসজিদ।

এই ছোট্ট মসজিদটি স্থানীয় স্থাপত্যশিল্প প্রতিষ্ঠান পিএসএ স্টুডিও কর্তৃক নির্মিত হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটি সমাজে বহুমুখী উন্নয়নমূলক কাজ করে যাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির প্রাধান স্থাপত্যশিল্পী এরিও উইরাসটোমো জানান, বহুমুখী উন্নয়নমূলক কাজের অংশ হিসেবে আমরা বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট দোকান, প্রার্থনাকক্ষ, আশ্রয়স্থান, বাসস্টপ, নিরাপত্তা চৌকি নির্মাণ করে থাকি।

এসব স্থাপনা আমরা ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ক্রেট দ্বারা নির্মাণ করি; কারণ প্লাস্টিকের ক্রেট দ্বারা নির্মিত কোনো স্থাপনা যেকোনো সময় যেকোনো আকৃতিতে পরিবর্তন করা যায়, আর এসব দিয়ে সহজেই স্থাপনার ছাদ ও দেয়াল বানানো যায়।

মসজিদটির ছাদ, দেয়াল ও জুতা রাখার বাক্স বানানোর জন্য সর্বমোট ১২০৮ টি প্লাস্টিকের ক্রেট প্রয়োজন হয়েছে। এই মসজিদটিতে মুসল্লিদের ওজু করার জন্য পানির কলও রয়েছে।

দেয়াল ও ছাদ বানাতে ক্রেটগুলো জোড়া লাগানোর জন্য লোহার কুড়ুপ ব্যবহার করা হয়েছে। আর ছাদ ধরে রাখার জন্য ফাঁপা ধাতব খুঁটি ব্যবহার করা হয়েছে।

মসজিদটিতে নারী-পুরুষের প্রবেশের জন্য দুটি ভিন্ন দরজা রয়েছে। আর এতে সর্বমোট তিনটি কাতার করা যায় যেগুলোর প্রত্যেকটিতে নয়জন করে মুসল্লি দাঁড়াতে পারে।

তবে প্রথম কাতারে শুধুমাত্র ইমাম সাহেব দাঁড়ান, আর বাকি দুটির একটিতে দাঁড়ায় পুরুষ মুসল্লি ও অন্যটিতে নারী মুসল্লি।

উইরাসটোমো জানান, যেহেতু মুসলমানরা যেখানেই থাকুক না কেনো তাদেরকে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত অবশ্যই আদায় করতে হয়, তাই এই ছোট্ট প্রার্থনাকক্ষটি রেস্টুরেন্টে আগত গেস্টদের উপকারে আসবে বলে আমরা আশা করি।

পুরোনো প্লাস্টিকের ক্রেট ব্যবহারের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে আমরা জনগণের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা তৈরি করতে চাই; আর সাথে সাথে প্লাস্টিকের অপচয়ও রোধ করা যায়।

পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিকের বর্জ্য উৎপাদন করা দেশগুলোর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া অন্যতম।

দেশটি প্রতি বছর প্রায় ৫.০৫ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য বের করে যার প্রায় ৮১% ই অপব্যবহার করা হয়। আর অপব্যবহৃত হওয়া বৈশ্বিক প্লাস্টিক বর্জ্যের শতকরা ১০ ভাগই বের হয় ইন্দোনেশিয়া থেকে, যা ২০২৫ সাল নাগাদ শতকরা ১১ ভাগে দাঁড়াবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

দেশটির আইন ও নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী লুহুত প্যান্ডজাইতান বলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে শতকরা ৭০ ভাগ প্লাস্টিক বর্জ্য কমিয়ে আনতে আমরা ইতিমধ্যে একটি কার্যকরী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি।

যার মাধ্যমে ২০৪০ সালের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া একটি প্লাস্টিক দূষণমুক্ত দেশে পরিণত হবে।

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন

Back to top button